সাম্যবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ, কিছু আলোকপাত
- Get link
- X
- Other Apps
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবৎকাল ও সময়ের পাঠ নিয়ে কিছু জরুরি প্রসঙ্গের অবতারণা করছি প্রথমেই। সময়; সামাজিক ব্যবস্থা ও সমাজমানসের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষে তাঁকে প্রণাম ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে প্রথমেই যে প্রেক্ষাপটটি তুলে ধরতে হয় তা হচ্ছে মার্ক্সবাদের প্রসঙ্গ। কারণ কবি ছিলেন আদ্যন্ত মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী। এই প্রাসঙ্গিকতায় আমরা কিছুটা পেছন ফিরে তাকাচ্ছি।
১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে মার্ক্সবাদী তত্ত্ব অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনশীলতার সূচক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৪৮ সালে ইউরোপীয় পরিবর্তনকামী মানুষের পরিমণ্ডলে এই তত্ত্ব আলোচিত হতে থাকে। ১৮৬৮ সালে জার্মান দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী মহান চিন্তক কার্ল মার্ক্স তাঁর দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিকভাবে পরিবর্তনকামী সমাজকাঠামোর বিস্তারিত তত্ত্বভিত্তিক গ্রন্থ “দাস ক্যাপিটাল’' প্রকাশ করেন। সেই তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে ভাবনার ক্ষেত্রকে নতুন দিশা দেখায় এবং চিন্তা ও মননের জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। লেনিনের নেতৃত্বে রুশ বিপ্লবের পর তা বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্য পর্যায় থেকে বিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের পূর্বপর্যায় পর্যন্ত সেই বৈপ্লবিক ধ্যান ধারণার বিপুল প্রভাব লক্ষ করা যায়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব অনস্বীকার্য।
বিদ্রোহী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম ১৫ইআগস্ট ১৯২৬, মৃত্যু ১৩ই মে ১৯৪৭। মাত্র ২১ বছরের জীবৎকালের সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর মার্ক্সবাদে দীক্ষিত হওয়া, তাঁর কাব্যশক্তির বিকাশ ঝলসে ওঠা এবং নশ্বর দেহ ছেড়ে যাওয়া যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, যা যে কোনও সময় জ্বলে উঠতেও পারে। অসাধারণ প্রতিভাধর এই কবির জনপ্রিয়তাও বিস্ময়কর। তাঁর কবিতা যে আবহের জন্ম দেয়, তা নি:সন্দেহে বৈপ্লবিক, তরুণদের রক্তে বিপ্লবের দামামা বাজিয়ে দেওয়ার মতোই, কারণ তা বারবার সামাজিক বৈষম্যকে চিনিয়ে দেয় আর যারা বৈষম্য টিঁকিয়ে রাখতে চায় নিজেদের স্বার্থরক্ষার কারণে তাদেরও তর্জনি তুলে সরাসরি দেখিয়ে দেয়। এই প্রতিভা প্রাতিস্বিক ও বিস্ময়কর।
সময় বড়োই শক্তিশালী, সময়ই একজন প্রতিভাধর কবির বয়ান তৈরি করে দেয়। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কাব্যিক বয়ান তৈরি করেছিল সেই সময়। তাঁর জন্মতারিখটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেন ভবিষ্যতের সংকেতবাহী, মৃত্যুসালটিও তেমনই। হয়তো সংকেতময়তা পুরোপুরি তাৎপর্যবহ হয়ে উঠতে পারেনি, তার কারণ বিশ্লেষণের স্থান এই পরিসর নয়। তবে আজ অবধি মানুষের সার্বিক স্বাধীনতার লড়াইয়ের সাথে সুকান্তের কবিতার একটি অন্তর্লীন সুর যুক্ত হয়ে আছে।
১৯২৬ থেকে ১৯৪৭ সেই সময়কালের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা যাক। ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তখন লক্ষ করা যাচ্ছে চরম অস্থিরতা, স্বাধীনতা সংগ্রাম, সাম্প্রদায়িক বিভাজনমূলক ষড়যন্ত্র, গান্ধীজির নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কলকাতা শহরে নারকীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভারত ছাড়ো আন্দোলন, কমিউনিস্ট আন্দোলন, সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন সব কিছুই দেখতে পাই সুকান্তের ভট্টাচার্যের মাত্র একুশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবদ্দশায়, সাথে ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খাওয়া কবির দেহে ক্ষয়রোগের সূত্রপাত এবং তাঁকে পৃথিবী থেকে ছিনিয়ে নেওয়া।
এই একুশ বছরের পরিসরে কবি লিখেছেন নিরন্তর, তাঁর কবিতা মানুষের চেতনাকে জাগিয়েছে, শ্রেণীশত্রুকে চিনিয়েছে , দুর্দিনকে চিহ্নিত করেছে। তাঁর কবিতার স্বর মানুষের প্রতি ভালবাসাকে ব্যক্ত করেছে, একটি সুস্থ সবল সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছে এবং দেখিয়েছে।
তাঁর মৃত্যুর পূর্বে একটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, এবং তা প্রকাশিত হয় কবির মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে। কাব্যগ্রন্থটি হলো “ছাড়পত্র”। স্বপ্নঘেরা কবির মানসলোক সদ্যভূমিষ্ট শিশুর কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ -
এসেছে নতুন শিশু
তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত, ধ্বংসস্তূপ বুকে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাবো, তবু যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই অঙ্গীকারের গ্রহণযোগ্যতা পঞ্চাশ, ষাট কিম্বা সত্তরের দশকে যুবসমাজের কাছে, কাব্যমোদী পাঠকদের কাছে ছিল অসাধারণ, সময় তার প্রবহমানতায় কিম্বা পরিবর্তনশীলতায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই দেশে নবজাতকের কাছে সেই অঙ্গীকারের প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি, কিন্তু কবি সেই দৃঢ় অঙ্গীকার বুকে নিয়েই এই পৃথিবীর রোদ জল মাটি থেকে পরিত্রাণ নিয়েছেন।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা কাব্যগ্রন্থগুলো প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পর শুধুমাত্র “ছাড়পত্র” ছাড়া। নিম্নলেখ কাব্যগ্রন্থগুলো পরবর্তীতে “সুকান্ত সমগ্রে” সংকলিত হয়েছে-
ছাড়পত্র - প্রকাশকাল ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ
পূর্বাভাস -১৯৫০
মিঠেকড়া - ১৯৫১
অভিযান - ১৯৫৩
ঘুম নেই- ১৯৫৪
হরতাল - ১৯৬২
গীতিগুচ্ছ - ১৯৬৫।
“ছাড়পত্র’' কাব্যগ্রন্থটি কবির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ। প্রতিটি কবিতায় আগামী পৃথিবীর জন্যে রেখে গেছেন একরাশ স্বপ্ন ও বিপ্লবী চেতনার জাগরণে দৃঢ় বিশ্বাস।”ছাড়পত্রে” র “আগামী” কবিতায় সদ্য অঙ্কুরিত এক ছোট্ট বীজ গনজাগরণ, বিপ্লব ও বিপ্লবোত্তর আগামী পৃথিবীর জন্যে সংকেতবাহিতার চমৎকার আবেদন নির্মাণ করেছে। “আগামী” চব্বিশ লাইনের কবিতা, তার থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি-
জড় নই, মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজ,
আমি তো জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজ ;
মাটিতে লালিত, ভীরু, শুধু আজ আকাশের ডাকে
মেলেছি সন্ধিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে আমাকে।
…………………..
ক্ষুদ্র আমি, তুচ্ছ নই- জানি আমি ভাবী বনস্পতি,
বৃষ্টির, মাটির রসে পাই আমি তারি তো সম্মতি,
সেদিন ছায়ায় এসো; হানো যদি কঠিন কুঠারে,
তবু তোমায় আমি হাতছানি দেবো বারেবারে ;
ফল দেবো, ফুল দেবো, দেবো আমি পাখিরও কূজন
একই মাটিতে পুষ্ট তোমাদের আপনার জন।
“ছাড়পত্র” কাব্যগ্রন্থে আরেকটি কবিতার উল্লেখ করছি, “চট্টগ্রাম :১৯৪৩”। ১৯৪৩ সালের চট্টগ্রামের পরিবেশ ছিল ভয়াবহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তি চট্টগ্রামকে বেছে নিয়েছিল ফ্রন্টলাইন শহর হিসেবে। জাপানকে প্রতিহত করতে চট্টগ্রামে দুটি বিমানবন্দর তৈরি করা হয়। যুদ্ধের বিমান ওঠানামার আতঙ্ক, জাপান অধিকৃত এলাকা থেকে শরণার্থীর ভিড়, পঞ্চাশের মন্বন্তরের দুর্বহ অবস্থা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে চতুর ব্যবসায়ীদের মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেওয়া ইত্যাদি সাধারণ জনজীবনে দু:সহ কষ্ট ডেকে আনে। সুকান্ত তখন লিখছেন "চট্টগ্রাম :১৯৪৩”। কিছু অংশ তুলে ধরছি-
ক্ষুধার্ত বাতাসে শুনি এখানে নিভৃত এক নাম
চট্টগ্রাম :বীর চট্টগ্রাম!
বিক্ষত বিধ্বস্ত দেহে অদ্ভুত নি:শব্দ সহিষ্ণুতা
আমাদের স্নায়ুতে স্নায়ুতে
বিদ্যুৎপ্রবাহ আনে, আনে আজ চেতনার দিন;
চট্টগ্রাম : বীর চট্টগ্রাম।
………………….
তোমার সংকল্পস্রোতে ভেসে যাবে লোহার গারদ
এ তোমার নিশ্চিত বিশ্বাস
তোমার প্রতিজ্ঞা তাই আমার প্রতিজ্ঞা, চট্টগ্রাম,
আমার হৃৎপিণ্ডে আজ তারি লাল স্বাক্ষর দিলাম।
“ঘুম নেই “ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা “প্রিয়তমাসু” তুর্কী কবি নাজিম হিকমতকে মনে করিয়ে দেয়। মোটামুটি সমসাময়িক এই কবির কবিতা ও সুকান্তের কবিতার অন্তর্লীন সুরে কোথাও যেন একটা সাদৃশ্য রয়ে গেছে। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় অনূদিত নাজিম হিকমতের “জেলখানার চিঠি” আর সুকান্ত ভট্টাচার্যের “প্রিয়তমাসু”র সুর কোথাও কি একই সূত্রে বাঁধা? নাজিম হিকমতকে বলা হতো রোমান্টিক বিদ্রোহী কবি। কবিতার বিদ্রোহী ভাষ্যে বহু বছর তাকে জেলখানায় কাটাতে হয়েছিল। সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন আগাগোড়া বিদ্রোহী কবি। “প্রিয়তমাসু” কবিতায় তেমন আবেগমথিত আবেদন নেই, যেমন রয়েছে নাজিম হিকমতের “ জেলখানার চিঠি” তে। “প্রিয়তমাসু” দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে লেখা। এক সৈনিকের বয়ানে লেখা তার প্রিয়তমাকে এক দীর্ঘ পত্রকবিতা, যাতে ফুটে উঠেছে মানবতার প্রতি গভীর বিশ্বাস ও তেতাল্লিশের মন্বন্তরের দুর্বহ যন্ত্রণা। দীর্ঘ কবিতাটির থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি-
সীমান্তে আজ আমি প্রহরী
অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করে
আজ এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছি,
স্বদেশের সীমানায়।
ধূসর তিউনিসিয়া থেকে স্নিগ্ধ ইতালি
স্নিগ্ধ ইতালি থেকে ছুটে গেছি বিপ্লবী ফ্রান্সে
নক্ষত্র নিয়ন্ত্রিত নিয়তির মতো
দুর্নিবার, অপরাহত রাইফেল হাতে
ফ্রান্স থেকে প্রতিবেশী বার্মাতেও।
…………………………
যুদ্ধ চাই না আর, যুদ্ধ তো থেমে গেছে
পদার্পণ করতে চায় না মন ইন্দোনেশিয়ায়।
আর সামনে নয়,
এবার পেছন ফেরার পালা।
পরের জন্যে যুদ্ধ করেছি অনেক
এবার যুদ্ধ তোমার আর আমার জন্যে।
প্রশ্ন করো যদি এতো যুদ্ধ করে পেলাম কী?
উত্তর তার -
তিউনিসিয়ায় পেয়েছি জয়
ইতালিতে জনগণের বন্ধুত্ব,
ফ্রান্সে পেয়েছি মুক্তির মন্ত্র;
আর নিষ্কন্টক বার্মায় পেয়েছি
ঘরে ফেরার তাগাদা।
আমি যেন সেই বাতিওয়ালা,
যে সন্ধ্যায় রাজপথে পথে বাতি জ্বালিয়ে ফেরে
নিজের ঘরেই জমে থাকে দু:সহ অন্ধকার।
কবিতায় প্রিয়তমাকে দারিদ্রের মধ্যে ফেলে রেখে যুদ্ধে আসার বেদনাবহ উক্তিও রয়েছে।
সুকান্ত ভট্টাচার্য জন্মেছিলেন এক নিম্নবিত্ত পরিবারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তিনি নেননি। প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবার পর তিনি সাম্যবাদী বামপন্থী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হন। আর্থিক অনটন ছিল। সুচিকিৎসার জন্যে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তার অভাব ছিল। মাত্র একুশটি বছরের জীবৎকাল। তার মধ্যে তাঁর কাব্যপ্রতিভার উন্মেষ, বিকাশ ও অবসান। মাত্র একুশটি বছরের বসন্তে তিনি তাঁর প্রিয়তমা স্বদেশকে দিয়ে গেলেন গভীর প্রজ্ঞা, মানবতাবাদ, সাম্যবাদ ও লড়াকু মানুষের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। তাঁর প্রতিটি কবিতার পেছনে রয়েছে সমসাময়িক কালের প্রেক্ষাপট যা ঐতিহাসিক গবেষণার অবকাশ রেখে গেছে। জন্মশতবর্ষে তাঁকে জানাই শতকোটি প্রণাম।
……………………………………………..
# বিজয়া দেব।
২২৫, পূর্বাচল রোড নর্থ
কলকাতা -৭০০০৭৮
- Get link
- X
- Other Apps
Comments
Post a Comment