Posts

Showing posts from November, 2026

সাম্যবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ, কিছু আলোকপাত

  সাম্যবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ, কিছু আলোকপাত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবৎকাল ও সময়ের পাঠ নিয়ে কিছু জরুরি প্রসঙ্গের অবতারণা করছি প্রথমেই। সময়; সামাজিক ব্যবস্থা ও সমাজমানসের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষে তাঁকে প্রণাম ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে  প্রথমেই যে প্রেক্ষাপটটি তুলে ধরতে হয় তা হচ্ছে মার্ক্সবাদের প্রসঙ্গ। কারণ কবি ছিলেন আদ্যন্ত মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী। এই প্রাসঙ্গিকতায় আমরা কিছুটা পেছন ফিরে তাকাচ্ছি।   ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে মার্ক্সবাদী তত্ত্ব অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনশীলতার সূচক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৪৮ সালে ইউরোপীয় পরিবর্তনকামী মানুষের পরিমণ্ডলে এই তত্ত্ব আলোচিত হতে থাকে। ১৮৬৮ সালে জার্মান দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী মহান চিন্তক কার্ল মার্ক্স  তাঁর দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিকভাবে পরিবর্তনকামী সমাজকাঠামোর বিস্তারিত তত্ত্বভিত্তিক গ্রন্থ “দাস ক্যাপিটাল’' প্রকাশ করেন। সেই তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে ভাবনার ক্ষেত্রকে নতুন দিশা দেখায় এবং চিন্তা ও মননের জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে।  লেনিনের নেতৃত্বে রুশ বিপ্লবের পর ত...

নারীচেতনার উৎসপর্যায়ে মেয়েদের পত্রাবলী

  নারীচেতনার উৎসপর্যায়ে মেয়েদের পত্রাবলী মেয়েদের লেখালেখির উৎসবিন্দু নিয়ে এ  আলোচনার সূত্রপাত। আমরা এ-ও দেখে নেব কোন কোন সাময়িক পত্র সেইসময়ে মেয়েদের লেখা প্রকাশে এগিয়ে এসে মেয়েদের লেখনীকে কে উৎসাহিত করেছিলেন।     মিশনারিদের দ্বারা পরিচালিত "সমাচার দর্পণ", রাজা রামমোহন রায়ের দ্বারা পরিচালিত "সম্বাদ কৌমুদী", ডিরোজিও শিষ্যদের দ্বারা পরিচালিত "জ্ঞানান্বেষণ", "সম্বাদ ভাস্কর", ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রেরণায় পন্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের দ্বারা প্রকাশিত ও পরবর্তীতে শিবনাথ শাস্ত্রী, মোহনলাল বিদ্যাবাগীশ ও কৈলাশনাথ বিদ্যাভূষণ পরিচালিত "সোমপ্রকাশ" ইত্যাদি সাময়িক পত্রে অন্তরালের নারীরা প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন নিজেদের ভাষায় নিজেদের যন্ত্রণার আলেখ্য নিয়ে।     উৎসবিন্দুতে পত্র আকারেই তাঁদের লেখা প্রকাশ পেতে দেখি। এ আলোচনায় নারীচেতনার উৎসপর্যায়ে প্রকাশিত তিনটি পত্রে আলোকপাত করছি।       মেয়েদের লেখালেখির উৎসপর্যায়ে একটি ধোঁয়াশার বেড়াজালও রয়েছে। সেই সময়ে অনেক পুরুষ মেয়েদের ছদ্মনামে লিখতেন। সেজন্যেই মেয়েদের লেখালেখিকে অনেক পাঠক ছ...

দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে “ কেন চেয়ে আছো গো মা “ - এক উপলব্ধি

   দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে “ কেন চেয়ে আছো গো মা “ - এক উপলব্ধি  রবীন্দ্রদর্শনের ছোঁয়ায় সিক্ত হয়ে আছে তাঁর সৃষ্ট যাবতীয় সঙ্গীত। সত্যনিষ্ঠা, প্রকৃতিপ্রেম, ঔপনিষদিক মূল্যবোধের পথই ছিল তাঁর সৃজনভুবনের যাত্রাপথ। তাই তাঁর গান স্বতই আমাদের ভিন্নলোকে নিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের গানের কথা এবং সুর দুয়েরই এক নির্দিষ্ট যাত্রাপথ রয়েছে। গানের কথাকে সুরে ভাসিয়ে না দিয়ে তাঁর কথাকে কিছুটা ভেঙে সুরাশ্রয়ী করে গানের বার্তাকে পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে থাকে রবীন্দ্রগানের অনন্য সুরপ্রকৃতি। শব্দাবলীর স্পষ্ট উচ্চারণভঙ্গিমা এই মহত্তম কাজটি সুচারুভাবে করে থাকে, যা আমরা  সমৃদ্ধরূপে পাই দেবব্রত বিশ্বাসের গানে।  এই নিবন্ধে একটি গানই আলোচ্য এবং অবশ্যই সেইটি ব্যক্তিগত উপলব্ধিজাত, “কেন চেয়ে আছ গো মা মুখপানে”। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আলোচনার গতিমুখ প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের শেষ চলচ্চিত্র “যুক্তি তক্কো আর গপ্পো” তে  দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে “কেন চেয়ে আছো গো মা “ গানটির সমকালীন অস্থির সময়ের সাথে সাযুজ্য রেখে চমৎকার প্রয়োগকৌশলে।   “যুক্তি তক্কো আর গপ্পো”র বিষয়ীভূত প্রসঙ্গের প...

দেশভাগ ও চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখা

  দেশভাগ ও চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখা  দেশভাগ, ভারতবর্ষের জন্যে এক অভিশাপ। সেই দেশভাগের যন্ত্রণা ক্ষতবিক্ষত করেছিল সমকালীনতা থেকে অনেকটা অগ্রসর চিত্রপরিচালক অনন্য প্রতিভাধর ঋত্বিক ঘটককে। “মেঘে ঢাকা তারা”, “সুবর্ণরেখা”, “কোমল গান্ধার” এই তিনটি চলচ্চিত্রেই তিনি দেশভাগের প্রসঙ্গ এনেছেন।  ১৯৬০ সালে রিলিজ হয় “মেঘে ঢাকা তারা। মাত্র আটটি ছবি করেছিলেন ঋত্বিক-  ১. অযান্ত্রিক (১৯৫৮) ২.পলাতক ( ১৯৫৯) ৩.মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) ৪. কোমল গান্ধার (১৯৬১) ৫. সুবর্ণরেখা ( ১৯৬৫) ৬. তিতাস একটি নদীর নাম(১৯৭৩) ৭. নাগরিক (১৯৭৭) ৮. যুক্তি তক্কো আর গপ্পো ( ১৯৭৭) এরমধ্যে দেশভাগ প্রসঙ্গ নিয়ে ত্রয়ী ছবি থেকে “সুবর্ণরেখা’' নিয়ে সামান্য আলোকপাত করছি সংক্ষিপ্ত পরিসরে।  “সুবর্ণরেখা” ছবিটি রিলিজ হয় ১৯৬৫ সালে। চলচ্চিত্রের নির্মাণকাল ১৯৬২ থেকে। একটি নদী সুবর্ণরেখা, সমস্ত মানুষের পুনর্বাসনের লড়াই এর পাশাপাশি বয়ে চলেছে তার উদাসীন প্রকৃতিকে নিয়ে। প্রশ্ন জাগে কেন ঋত্বিক এই চলচ্চিত্রের নাম সুবর্ণরেখা রাখলেন? নদীর উদাসীন প্রকৃতির সাথে কি শরণার্থী মানুষের জন্যে পারিপার্শ্বিকের ঔদাসিন্যের কোনও সাযুজ...

অন্ধকারের ইতিকথা -"প্রাগৈতিহাসিক"

  অন্ধকারের ইতিকথা -"প্রাগৈতিহাসিক" "......ভিখুর গলা জড়াইয়া ধরিয়া পাঁচী তাহার পিঠের ওপর ঝুলিয়া পড়িল। তাহার দেহের ভারে সামনে ঝুঁকিয়া ভিখু জোরে জোরে পথ চলিতে লাগিল। পথের দু'দিকে  ধানের ক্ষেত আবছা আলোয় নি:সাড়ে পড়িয়া আছে। দূরগ্রামের গাছপালার পিছন হইতে নবমীর চাঁদ আকাশে উঠিয়া আসিয়াছে।  ঈশ্বরের পৃথিবীতে শান্ত স্তব্ধতা।   ৷  হয়তো ওই চাঁদ আর এই পৃথিবীর ইতিহাস আছে। কিন্তু যে ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্রহ করিয়া দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচী পৃথিবীতে আসিয়াছিল এবং যে অন্ধকার তাহারা সন্তানের মাংস আবেষ্টনীর মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক।  পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই। কোনদিন পাইবেও না।" ৷ "প্রাগৈতিহাসিক " গল্পের পরিশেষে লেখক মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় বস্তজগতের রূপময়তায় এই আদিম গোপন আঁধারের উদ্ভাসন ঘটিয়েছেন। প্রাগৈতিহাসিক এক আশ্চর্য কথকতার কুহকজাল। এই আদিমতার কুহকজাল পাঠককে টেনে নিয়ে যায় ভিন্নতর এক রূপজগতে - যে রূপজগতটি সভ্যতার এবং অসভ্যতারও বাইরের এক জগত, এ এক আদিম ও অকৃত্রিম জৈবজগত যার বাসনাপ্রখর মায়াজাল পরিদৃশ্যমান জগতের সূক্ষ...

দ্রৌপদী’-এক বহুস্বরীয় কণ্ঠস্বর

  দ্রৌপদী’-এক বহুস্বরীয় কণ্ঠস্বর ‘দ্রৌপদী’ গল্পটির শুরুতেই পরিচয় পেয়ে যাই দ্রৌপদীর-‘নাম দ্রৌপদী মেঝেন, বয়স সাতাশ, স্বামী দুলন মাঝি(নিহত), নিবাস চেরাখান, থানা বাঁকড়াঝাড়, কাঁধে ক্ষতচিহ্ন(দোপদি গুলি খেয়েছিল, জীবিত বা মৃত সন্ধান দিতে পারলে এবং জীবিত হলে গ্রেপ্তারে সহায়তায় একশত টাকা...’কেন দ্রৌপদীকে গ্রেপ্তার হতে হবে?আদিবাসী মহিলাটি তকমাধারীর ভাষায়-‘মোস্ট নটোরিয়াস মেয়েছেলে। লং ওয়ান্টেড ইন মেনি...’কেন ‘নটোরিয়াস’? দুলন ও দ্রৌপদী মানে দোপদি মেঝেন ‘নিয়নডারথাল’ অন্ধকারে নিখোঁজ থাকে, আত্মগুপ্তিতে তাদের অসাধারণ দক্ষতা, লাশের মাঝখানে এরা নিহতের ভান করে পড়ে থাকতে জানে। উনিশশো একাত্তর সালে বিখ্যাত অপারেশন বাকুলিতে যখন তিনটি গ্রাম কর্ডন করে মেশিনগান করা হয় তখন দুলন ও দোপদি লাশের মাঝখানে নিহতের ভান করে পড়েছিল। প্রভাতে লাশ গুনতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সন্ধান না পেয়ে ক্যাপ্টেন অর্জন সিং এর ‘ব্লাড সুগার’ বেড়ে যায়। তকমাধারী সভ্যতার কাছে আদিবাসী সমাজ ও সংস্কৃতি, তাদের অনাদর, ক্ষুধা, ঘুরে দাঁড়ানোর সাহসী উদ্যম খুবই চিন্তার বিষয়। যে আদিবাসীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী, যে মেকি সভ্যতাকে উপেক্ষায় বর্জন ...